শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০০৮

ফয়সালের দূর্ঘটনা ও বার্ন ইউনিট ডি এম সি।


গত ৬ই নভেম্বর বৃহ: বিকালে আমার স্ট্রাকচার কুইজ ছিলো। কিছুই পড়ি নাই আগে। ফাইলও ইনকমপ্লিট। তাই সকাল সকাল রশীদ হলে চলে আসলাম। ২০১১ তে যেয়ে দেখি রুম বন্ধ। পোলাপাইন এক্সট্রা ক্লাসে গেছে। যারা নিয়মিত ক্লাসই করে না তাগো হঠাৎ এক্সট্রা ক্লাস করার ঝোঁক উঠলো ক্যান বুঝলাম না। কি করবো ৫০০৫-এ গিয়ে ফয়সাল এর রুমে বসলাম। ও তখন ফাইল লিখছিলো। আমার সাথে কথা হলো অনেকখন। বললো শুক্রবার ওর ছোট বোনের মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা। সে আজ চট্রগ্রাম যাবে এবং তার বোনকে কেন্দ্রে নিয়ে যাবে। তারপর আমাকে রেখে সে চলে যায় স্যারের সাথে দেখা করতে। তখনো আমি জানি না ওর জন্য কি দূর্ভাগ্য অপেক্ষা করছে।

রাতে নজরুলে গরু খাওয়া উৎসবে গিয়েছি। ওখানেই শুনি ফয়সালের দূর্ঘটনার কথা। আমরা তখনো জানি না এসিড ভর্তি ট্রাকের সাথে বাসের সংঘর্ষের কথা। শামসকে ফোন করে জানতে পারলাম ফয়সাল আউট অফ ডেন্জার। কুমিল্লার সি এম এইচে আছে। আমি মনে করেছি, হাত-পা বোধ হয় ভেঙেছে। অবশ্য শুধু আমি না, আমরা সবাই প্রথমে তাইই মনে করেছিলাম। রাতে দশটার দিকে খবর পেলাম ফয়সালের শরীর এসিডে পুরে গ্যাছে এবং তাকে ঢাকা মেডিকেলের ডি এম সি তে আনা হচ্ছে। এবং এই দূর্ঘটনায় ১০ জন মারা গেছে।

শুনলাম চারটা এম্বুলেন্সে আহতদের আনা হয়েছে। একটা বাচ্চা ও একজন মহিলাকে আনা হয়েছে চাটাই বেঁধে। তাদের শরীর এসিডে এমন ভাবেই ঝলসে গ্যাছে যে শরীর থেকে মাংস খুলে খুলে পড়ে এই অবস্থা।তাই চাটাই দিয়ে বাধা হয়েছিলো। এদের তুলনায় ফয়সালকে অনেক কম আহত মনে হলো। তবুও যা হয়েছে খুব একটা কম নয়। ফর্সা, গোলগাল শরীরটা পুড়ে কালো হয়ে গ্যাছে। তবুও সে আমাদের সহযোগিতায় হেটে বার্ন ইউনিটে প্রবেশ করে। বেড পেলাম না। মেঝেতে ব্যাবস্থা করতে হলো। আদনান সে তার বাসা থেকে তোষক, বালিস ইত্যাদি ব্যবস্থা করে। ডিউটিরত ডাক্তার বললেন, ৪০% বার্ন। শুধু একটা চোখ আশঙ্কাজনক, টেষ্ট করাতে হবে। আর আপাতত ড্রেসিং করে দিলেন।

পরদিন শুক্রবার গিয়ে দেখি আজব!! একটা ডাক্তারও নাই। চোখের টেষ্ট করাতে আই ইউনিটে নিতে হবে। কোন ওয়ার্ড বয় নেই যে ট্রলি ইত্যাদি ব্যাবস্থা করবে। আমরাই ট্রলি ব্যবহার করে ঠেলে ১৩ নং ওয়ার্ড। আই ইউনিটে নিয়ে গেলাম। এখানেও ডাক্তার নেই। নার্সের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে ডাক্তারকে ফোন করা হলো। তিনি এসে একটা আই ড্রপ লিখে দিলেন।টেষ্ট আজকে করা যাবে না বলে জানালেন। শুক্রবারটা এমনি গেল। পিজিতে নিয়ে টেষ্ট করাতে চাইলাম। পিজিও বন্ধ শুনলাম।

শনিবার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পাওয়া গেল। লবিং করে একটা বেড ম্যানেজ করা হলো। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার জানালেন আসলে চামড়ার ৬০% ডেপথ পুরে গ্যাছে। যেখানে ৫০-৫৫% হলেই কেস সিভিয়ার। একটা চোখ ৮০%। ৫ টি ইমিডিয়েট সার্জারী প্রয়োজন। এবং প্রায় ১০-ৃ৫ লাখ টাকা লাগবে। বর্তমানে সম্পূর্ন চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ২০-২৫ লাখ টাকা। ওকে স্পেশাল কেয়ার ইউনিটে নেয়া হলো। কিন্তু ওর সেবা ঠিক মতো হচ্ছিলো না। দিনে একবার ড্রেসিং করতে বলা হলেও ওরা দুই দিন পর পর ড্রেসিং করছিলো। তাই গতকাল ওকে সিটি হসপিটালে ট্রান্সফার করা হয়।

এসিডের ব্যাপারে বলতে হয়, ফিল্টার পানির নীল প্লাস্টিকের বোতলগুলাতে করে এসিড নেয়া হচ্ছিল। ১০০% ওলিয়াম। ডায়ালুটেটেডও না। কি করে সম্ভব!!!!????? এ রকম একটা ব্যাস্ত মহাসড়কে!!!

যাই হোক বার্ন ইউনিটের গন্ধ আমার শরীরে এখনো লেগে আছে।
ফয়সালের জন্য দোয়া করবেন। ওর ফ্যামিলি ফাইনানসিয়ালি এত স্ট্রং না। বাবা প্যারালাইজস। দুই ভাইবোনের মধ্যে ও সবার বড়। থাকতো চট্রগ্রামে। এখানে রশীদ হলে ৫০০৫-এ থাকতো। বুয়েট লাইফ প্রায় শেষ…শুধু পরীক্ষা বাকি……জীবনকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিলো হয়তো তার। তার স্বপ্নগুলোকে যে বাঁচাতেই হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন